ভাত চুরির অভিযোগে মৃত্যু : বিচার কি মানুষের হাতে?

স্বপন বিশ্বাস

খুলনায় একটি ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী হলের পেছনে ইসলামনগর সড়কের একটি ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে।

২১ বছর বয়সী আজমুল চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মাত্র কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেসের ম্যানেজারের ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে আজমুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এরপর তাকে কয়েকজন মিলে মারধর করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। একপর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে সত্যিকারে কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল এবং কী ঘটেছিল, এসবের চূড়ান্ত সত্য তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

ইতোমধ্যে নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার তদন্ত করছে। ফলে এই মুহূর্তে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে অপরাধের সিদ্ধান্ত দেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ঘটনাটিকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই।

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলে তার বিচার করার অধিকার কার? আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর উত্তর স্পষ্ট, অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ সংগ্রহ হবে এবং আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। অভিযোগ সত্য হলেও শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া আইন নির্ধারণ করে; মানুষের ক্ষোভ বা উত্তেজনা নয়। ধরা যাক, আজমুল সত্যিই অন্যের ভাত অনুমতি ছাড়া খেয়েছেন। সেটি অন্যায় হতে পারে, এমনকি চুরির অভিযোগও হতে পারে। কিন্তু কোনো অপরাধের অভিযোগে একজন মানুষকে মারধর করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না। অপরাধের মাত্রা যাই হোক, তার বিচার নির্ধারিত পদ্ধতিতে হওয়াই সভ্য সমাজের নিয়ম। একটি খাবার চুরি করার অভিযোগ এবং একজন মানুষের জীবন-এই দুটি বিষয়কে একই পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই। এই ঘটনা আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণের পার্থক্য রয়েছে। কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না। তদন্তের প্রয়োজন হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয় এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কারণ আজ যে ব্যক্তি অভিযোগের শিকার, আগামীকাল একই পরিস্থিতিতে অন্য কেউও পড়তে পারেন। আইনের শাসনের মূল কথা হলো, অপরাধের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে। জনতার হাতে বিচার চলে গেলে সেখানে ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা থাকে, নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং প্রকৃত অপরাধীরাও অনেক সময় আইনের আওতার বাইরে থেকে যেতে পারেন। তাই কোনো অপরাধের অভিযোগ শুনে উত্তেজিত হওয়ার বদলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করাই দায়িত্বশীল আচরণ। আজমুলের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। একটি অভিযোগ কীভাবে একটি তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হলো, সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটিও মনে রাখতে হবে, তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। নিহতের পরিবার যেমন ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে, তেমনি অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিরও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার অধিকার রয়েছে। এটাই আইনের শাসনের স্বাভাবিক নীতি।

আজমুল হোসেনের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে-আমরা কি অভিযোগের বিচার আইন ও আদালতের মাধ্যমে করব, নাকি নিজেরাই বিচারকের ভূমিকা নেব? সভ্য সমাজের উত্তর একটাই হওয়া উচিত। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মানুষের হাতে মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত চলে যেতে পারে না।

একজন মানুষের জীবন কোনো অভিযোগের চেয়ে বড়। তাই ‘ভাত চুরি’ সত্যি ছিল কি না, তার বিচার তদন্তে হবে; কিন্তু সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন তরুণের মৃত্যু কীভাবে ঘটল, তার সত্য উদ্ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক : প্রধান শিক্ষক, শেওজগাতি আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কবি।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন